মুক্ত স্বদেশ দুই হাত নেই, তবু থামেনি লড়াই, পা দিয়ে পড়ান ১৪৫ শিশু | মুক্ত স্বদেশ

দুই হাত নেই, তবু থামেনি লড়াই, পা দিয়ে পড়ান ১৪৫ শিশু


নিউজ ডেস্ক অক্টোবর ৬, ২০২৬, ৭:০৮ অপরাহ্ন
দুই হাত নেই, তবু থামেনি লড়াই, পা দিয়ে পড়ান ১৪৫ শিশু

জন্ম থেকেই নেই দুই হাত। অথচ পা দিয়েই ব্ল্যাকবোর্ডে চমৎকার লিখে প্রতিদিন শিশুদের পাঠদান করছেন নরসিংদীর আলতাফ হোসেন, যিনি এলাকায় ‘দুঃখু মিয়া’ নামেই বেশি পরিচিত। শারীরিক এই চরম সীমাবদ্ধতা ও শত প্রতিকূলতা তাকে দমাতে পারেনি। জীবনের প্রতিটি বাধাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পড়াশোনা শেষ করে চাকরি না পেয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের পৈতৃক জমিতে গড়ে তুলেছেন একটি কিন্ডারগার্টেন বিদ্যালয়। বর্তমানে তার সেই বিদ্যালয়ে আলো ছড়াচ্ছে, যেখানে পড়াশোনা করছে ১৪৫ শিশু।

১৯৬২ সালে নরসিংদী সদর উপজেলার নগর পাঁচদোনা এলাকায় জন্ম নেওয়া আলতাফ হোসেনের বাবা ছিলেন মৃত তমিজ উদ্দিন। জন্মের পর তার তিন ভাই মারা যাওয়ায় এবং দুই হাত না থাকায় দাদা আদর-আক্ষেপ করে তার নাম রাখেন ‘দুঃখু মিয়া’। ছোটবেলায় স্থানীয় দিঘিরপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনার হাতেখড়ি হয় তার। হাত না থাকায় ছোটবেলা থেকেই বাবার সহযোগিতায় পাতিলের কালি ও কঞ্চির সাহায্যে দুই পায়ের আঙুলের ফাঁকে ধরে লেখার অদ্ভুত অভ্যাস গড়ে তোলেন। এরপর হার না মানা মানসিকতায় পা দিয়েই লিখে মাধ্যমিক (১৯৮২), উচ্চমাধ্যমিক (১৯৮৪) এবং ১৯৮৬ সালে নরসিংদী সরকারি কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করেন।

শিক্ষাজীবন শেষে শুরু হয় তার কর্মসংস্থানের কঠিন সংগ্রাম। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরে চাকরির জন্য আবেদন করে লিখিত ও ভাইভায় উত্তীর্ণ হলেও বহুবার ব্যর্থ হন। দ্বারে দ্বারে ঘুরেও যখন কোনো চাকরি জোটেনি, তখন হতাশার সাগরে না ডুবে তিনি বেছে নেন শিক্ষকতার পথ। টিউশনি ও কোচিং করিয়ে কিছু টাকা জমানোর পাশাপাশি বাবার দেওয়া জমিও বিক্রি করেন। সেই জমানো অর্থ ও জমির ওপর ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘প্রতিভা দুঃখু মিয়া কিন্ডারগার্টেন’।

বর্তমানে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা এই বিদ্যালয়ে ১০ জন শিক্ষক ও দুজন কর্মচারী রয়েছেন। বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত ও প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিদ্যালটিতে বিনা মূল্যে পড়াশোনার সুব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

শৈশবের একটি মর্মান্তিক স্মৃতি আজও তাড়িয়ে বেড়ায় দুঃখু মিয়াকে। ছোটবেলায় বাবা তাকে স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় ভর্তি করতে নিয়ে গেলে দুই হাত না থাকার অজুহাতে এবং পা দিয়ে ধর্মীয় গ্রন্থ পড়তে হবে—এই কারণ দেখিয়ে তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। মূলত সেই বঞ্চনা ও অবহেলার স্মৃতিই তাকে পরবর্তী সময়ে নিজের এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। তিনি জানান, এলাকার কোনো শিশু যেন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয় এবং কোনো প্রতিবন্ধী শিশু যেন তার মতো হেয় প্রতিপন্ন না হয়, সে উদ্দেশ্যেই এই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন।

দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব উদ্যোগে বিদ্যালয়টি চালালেও সরকারি কোনো আর্থিক সহায়তা না পাওয়ার আক্ষেপ রয়েছে তার। বর্তমানে তার এই মহৎ লড়াইয়ে ছায়ার মতো পাশে রয়েছেন তার নিজের ছেলেও, যিনি বিদ্যালয়টিতে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন। বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী কাওছার জানায়, তাদের স্যারের পায়ের হাতের লেখা অনেকের হাতের লেখা থেকেও সুন্দর এবং তিনি অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে তাদের পড়ান।

চাকরি বা সহায়তার আশায় একসময় যে সমাজের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন, আজ সেই সমাজের শত শত শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ছেন আলতাফ হোসেন। দুই হাত না থাকলেও থেমে নেই তার এই আলোকিত পথচলা। পা দিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা তার প্রতিটি অক্ষর যেন জীবনযুদ্ধের একেকটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।