মুক্ত স্বদেশ নওগাঁয় স্কুল আয়ার রাজকীয় বিদায় সংবর্ধনা | মুক্ত স্বদেশ

নওগাঁয় স্কুল আয়ার রাজকীয় বিদায় সংবর্ধনা


নিউজ ডেস্ক অক্টোবর ১, ২০২৬, ৮:০৩ অপরাহ্ন
নওগাঁয় স্কুল আয়ার রাজকীয় বিদায় সংবর্ধনা

নওগাঁ সদর উপজেলার ফতেপুর (১ম) উচ্চ বিদ্যালয়ের আয়া শেফালি বেগম দীর্ঘ ৩৪ বছরের একনিষ্ঠ ও নিঃস্বার্থ সেবা শেষে গত ৩০ সেপ্টেম্বর অবসরে গেছেন। তাঁর বিদায়লগ্নে বিদ্যালয় চত্বরে তৈরি হয়েছিল এক অভূতপূর্ব ও আবেগঘন পরিবেশ, যা সচরাচর কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিদায়বেলায়ও দেখা যায় না। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অশ্রুসিক্ত ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে তিনি রাজকীয় এক ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে ফিরে গেছেন নিজের বাড়িতে।

ব্যক্তিগত জীবনে অবিবাহিত শেফালি বেগমের নিজের কোনো সংসার বা সন্তান ছিল না। পুরো বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ ও শিক্ষার্থীরাই ছিল তাঁর আপন পরিবার। দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে দাপ্তরিক ও সেবামূলক দায়িত্ব পালন করেছেন। শিক্ষার্থীদের টিফিনের খোঁজ নেওয়া, মায়ায় জড়িয়ে তাদের ভুলত্রুটি শুধরে দেওয়া এবং কেউ অসুস্থ হলে মায়ের মতো পরম যত্নে সেবা করার কারণে তিনি সবার কাছে ‘শেফালি খালা’ নামে পরিচিত ছিলেন। শিক্ষকদের কাজের তাড়া কিংবা নিজের ক্লান্তি— কোনো কিছুই তাঁর এই সেবামূলক মানসিকতায় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।

শেফালি বেগমের অবসরের দিনে পুরো বিদ্যালয়ে এক শোকাতুর ও শ্রদ্ধাবনত পরিবেশের সৃষ্টি হয়। তাঁর এই ত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন করতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এক বর্ণাঢ্য বিদায়ি সংবর্ধনার আয়োজন করে। বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও নওগাঁ জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক নূর-ই আলম মিঠুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন প্রধান শিক্ষক সাজ্জাদুল ইসলাম, পরিচালনা কমিটির সদস্য লিটন হোসেনসহ অন্যান্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।

অনুষ্ঠানে শ্রদ্ধার স্মারক হিসেবে শেফালি বেগমের হাতে সংবর্ধনা উত্তরীয়, নগদ অর্থ ও বিভিন্ন উপহারসামগ্রী তুলে দেওয়া হয়। বিদায়ি বক্তৃতায় পরিচালনা কমিটির সভাপতি নূর-ই-আলম মিঠু বলেন, ‘‘শেফালি বেগম আমাদের বিদ্যালয়ের শুধু একজন কর্মচারী ছিলেন না, তিনি ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম এক স্তম্ভ। পদের দিক থেকে কেউ বড় বা ছোট হতে পারে, কিন্তু তাঁর কর্তব্যপরায়ণতা এবং মমত্ববোধ আমাদের সবার চেয়ে অনেক উঁচুতে। তাঁর এই নিঃস্বার্থ সেবার ঋণ বিদ্যালয় কোনোদিন শোধ করতে পারবে না।’’ অনুষ্ঠানের সবচেয়ে মানবিক ও চোখ জুড়ানো দৃশ্যটি তৈরি হয় বিদায়ের ঠিক পরপর। প্রথা ভেঙে শেফালি বেগমকে অত্যন্ত মর্যাদা ও ভালোবাসার সঙ্গে একটি সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়। এ সময় শত শত শিক্ষার্থী তাঁর পথজুড়ে ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে সম্মান জানান।

বিদায়ের এই ক্ষণে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কান্না এবং ভালোবাসায় এক অবিস্মরণীয় ও আবেগাপ্লুত দৃশ্যের অবতারণা হয়। ফতেপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের এই অনন্য উদ্যোগটি সমাজে এক বড় বার্তা দিয়ে গেছে—কাজের ছোট-বড় দিয়ে মানুষের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় না। সততা, নিষ্ঠা ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দিয়ে মানুষের হৃদয় জয় করতে পারলে প্রাতিষ্ঠানিক পদের গণ্ডি পেরিয়েও এমন রাজকীয় সম্মান পাওয়া সম্ভব। ফতেপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ইতিহাসে শেফালি বেগম চিরকাল মায়াবী এক মায়ের প্রতিচ্ছবি এবং এক সুমহান অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে থাকবেন।