মুক্ত স্বদেশ ঋণ খেলাপির ভয়াবহ অবস্থা থেকে উত্তরণ জরুরি | মুক্ত স্বদেশ

ঋণ খেলাপির ভয়াবহ অবস্থা থেকে উত্তরণ জরুরি


নিউজ ডেস্ক ডিসেম্বর ২২, ২০২৫, ১২:৪৯ পূর্বাহ্ন
ঋণ খেলাপির ভয়াবহ অবস্থা থেকে উত্তরণ জরুরি

বাংলাদেশে ঋণ খেলাপির অবস্থা ভয়াবহ। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে বাংলাদেশ ব্যাংক নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ব্যাংক ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংককে একীভূত করে একটি নতুন ব্যাংক, ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ নামে একটি ব্যাংক খুলছেন। যার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। নতুন গঠিত ব্যাংকে সরকার মূলধন যোগান দিচ্ছে এবং এটি দেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ফেরানোর লক্ষ্য নিয়ে একটি ব্যবস্থা।
এই ব্যাংকগুলো পযৎড়হরপ দুর্নীতি, ব্যবস্থাপনার অভাব এবং প্রচুর পরিমাণে খেলাপি ঋণ (ঘচখ) এর কারণে আর্থিক সংকটে পড়েছিল, যার ফলে আমানতকারীরা তাদের টাকা তুলতে পারছিলেন না। ফরেনসিক অডিটে এই ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার অত্যন্ত বেশি। এদের খেলাপি ঋণের হার হলো ৭৪% থেকে ৯৮% পর্যন্ত। পাঁচ ব্যাংক একীভূত হওয়ার পর গ্রাহকরা ধাপে ধাপে টাকা পাবেন, যেখানে প্রথমে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স স্কিমের আওতায় তোলা যাবে (প্রতি ঘওউ-তে একটি অ্যাকাউন্টে), এবং বাকি টাকা ধীরে ধীরে ফেরত দেয়া হবে, যা নতুন ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’-এর মাধ্যমে হবে, তবে এক্ষেত্রে অ্যাকাউন্ট নম্বর ও কার্ড পরিবর্তিত হতে পারে এবং কিছু টেকনিক্যাল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সময় লাগবে। এর ফলে সাধারণ গ্রাহক যারা তারা এই অবস্থায় মারাত্মক দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। ঋণ তো সাধারণ গ্রাহকরা দেননি, চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে বিভিন্ন স্কিমের আওতায় গ্রাহকরা টাকা জমা রেখেছেন।

গ্রাহকরা ডিপোজিট পেনশন স্কিমসহ বিভিন্ন লাভজনক হিসাবে করতেন টাকা জমা। দেখা গেছে অনেকেই তার চাকরির জীবন শেষ করার পর যে অর্থ পেয়েছেন, এই অর্থ দিয়ে এই হিসাবগুলো খুলেছিলেন। এখন তাদের মাথায় হাত। এই ব্যাংকগুলো খেলাপি হয়ে আজ মুখ থুবড়ে পড়েছে, এই ঋণ খেলাপির জন্য মূল দায়ী ব্যাংক কর্মীরা ও প্রভাবশালী মহল। ব্যাংকে গেলে দেখা যায়, সাধারণ গ্রাহক যারা স্বল্প টাকা জমা রাখেন, তাদেরকে ব্যাংক কর্মীরা অবজ্ঞার চোখে দেখে। অপরদিকে দেখা যায় যারা দুর্নীতি করে কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়ে খেলাপি হয়েছেন, এই রকম গ্রাহকদের দেখলে তারা চেয়ার থেকে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা জানান। ব্যাংক কর্মীদের অদক্ষতা ও দুর্নীতি ঋণ খেলাপির অন্যতম কারণ। আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক রাজশাহী শাখায় বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ রাজশাহী জেলা শাখা নামে একটি হিসাব রয়েছে, যার হিসাব নং ০১০০১৯০০৫৩৬৮২। এই হিসাব ডরমেট হয়ে যায়।

এই ডরমেট হিসাবটি পুনরায় চালু করার জন্য ২৫-১১-২০২৫ তারিখে ব্যাংকে সংঘের নেতৃবৃন্দ যোগাযোগ করে উক্ত শাখার রেহেনা নামে এক কর্মীর সাথে। তিনি তিনি প্রয়োজনীয় কিছু কাগজপত্র জমা দিতে বলেন। সংঘের দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসাব পরিচালনাকারীরা কাগজপত্রও জমা দেয়। সেই সাথে একটি একাউন্ট পেয়ি চেকও রেহেনার কাছে দেয় একাউন্টে জমা দেয়ার জন্য। তারপর তিনি ডরমেট হিসাব চালু করার জন্য কিছু টাকা একাউন্টে জমা দিতে বলেন। তার কথা অনুসারে ৫০০ টাকা হিসাবে জমা দেয়া হয়। তিনি জানান এই কাগজপত্র হেড অফিসে পাঠানো হবে। তারপর চলে গ্রাহক ঘুরানোর পালা। আট থেকে দশ বার ব্যাংকে যাওয়া হয় হিসাবটি চালু হয়েছে কি না জানার জন্য। প্রতিবারই রেহেনা জানায়, এত সহজে হবে না একটু সময় লাগবে। প্রায় মাসাধিকাল পর সংঘের হিসাব পরিচালনাকারীরা শাখার অপারেশন কর্মীর সাথে যোগাযোগ করে। তখন দেখা যায় যে রেহেনা আদৌ এই হিসাব ডরমেট মুক্ত করার কোনো ব্যবস্থা বা পদক্ষেপ নেয় নাই।

রেহেনা কর্তৃক গ্রাহক ভোগান্তির বিষয়ে শাখা কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এই কারণে কর্মীরা গ্রাহকের সাথে খারাপ আচরণ করার সুযোগ পায়। রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে ক্ষুদ্রঋণ নিতে গেলে গ্রাহককে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। ব্যাংককর্মী খারাপ আচরণ ও ভোগান্তির কারণে অনেক গ্রাহক ঋণ নিতে অনাগ্রহী হয়ে উঠে। পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, এই গ্রাহকরাই চড়া সুদে মহাজনী ঋণ নেয়। এ কথাও শোনা যায় যে, রাকাবের অনেক কর্মীই মহাজনী সুদে ঋণ কার্যক্রমে নেপথ্য অর্থ যোগানদার। ব্যাংক কর্মীদের আচরণের কারণে ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতা ও ক্ষুদ্র সঞ্চয়ী গ্রাহকরা ব্যাংকমুখী হতে চায় না। অথচ ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতারা কখনো খেলাপি হয় না। অপরদিকে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীরা নিয়মিত সঞ্চয় করে থাকেন। ব্যাংক খাত খেলাপির জন্য শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রভাবই দায়ী না এর সাথে দায়ী ব্যাংক কর্মীরাও।

ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদেই ১২ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। গত বছরের জুনে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা, যা ব্যাংক খাতের মোট বিতরণ করা ঋণের ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশ। যদিও সেই হিসাব নিয়েও ছিল বিশ্বাসযোগ্যতার ঘাটতি। গত বছরের আগস্টে সরকার বদলের পর হু হু করে বাড়তে থাকে খেলাপি ঋণ। বর্তমানে খেলাপি ঋণও দ্রুত বাড়তে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, সর্বশেষ গত সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। তাতে ব্যাংক খাতের বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশই এখন খেলাপি। দেশীয় ৫২ ব্যাংকের মধ্যে ৩০টির খেলাপি ঋণ ২০ শতাংশের নিচে। ৬টির খেলাপি ঋণ ২১ থেকে ৪৯ শতাংশের মধ্যে। ১৬টির মোট ঋণের ৫০ থেকে ৯৯ শতাংশ খেলাপি হয়ে গেছে, যা পুরো খাতের ওপর চাপ তৈরি করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সেপ্টেম্বর ভিত্তিক পরিসংখ্যান থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। খেলাপি ঋণের বাড়তি চাপের মধ্যেও বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে ১৭টি ব্যাংক।

এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের কম। এই ১৭ ব্যাংকের মধ্যে আবার ৫ শতাংশের নিচে খেলাপি ঋণ ছয় ব্যাংকের। খেলাপি কম থাকা ব্যাংকগুলো মুনাফাতেও শীর্ষে, করপোরেট উত্তম চর্চাতেও এগিয়ে আছে। ফলে এসব ব্যাংক দেশের ব্যাংক খাতের জন্য মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেসব ব্যাংকের ঋণ ১০ শতাংশের নিচে রয়েছে, তার মধ্যে মিডল্যান্ড ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৫ দশমিক ৪০ শতাংশ, পূবালী ব্যাংকের সাড়ে ৫ শতাংশ, মেঘনা ব্যাংকের ৬ দশমিক ১১ শতাংশ, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ, কমিউনিটি ব্যাংকের ৭ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপির ঋণের হার ৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ, এনসিসি ব্যাংকের ৮ দশমিক ৩১ শতাংশ, ঢাকা ব্যাংকের ৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ, উত্তরা ব্যাংকের ৮ দশমিক ৯১ শতাংশ, ট্রাস্ট ব্যাংকের ৮ দশমিক ৯৫ শতাংশ ও যমুনা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৯ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ।
দেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ ইউনিয়ন ব্যাংকের, ৯৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এরপর ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৯৬ দশমিক ২০ শতাংশ, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ৯৫ দশমিক ৭০ শতাংশ, পদ্মা ব্যাংকের ৯৪ দশমিক ১৭ শতাংশ ও আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের ৯১ দশমিক ৩৮ শতাংশ।

এ ছাড়া এবি ব্যাংকের খেলাপির হার ৮৪ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ, ন্যাশনাল ব্যাংকের ৭৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ, জনতা ব্যাংকের ৭৩ দশমিক ১৮ শতাংশ ও বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ৭১ দশমিক ১১ শতাংশ। বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৭০ দশমিক ৫৯ শতাংশ ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৭০ দশমিক ১৭ শতাংশ। আইএফআইসি ব্যাংকের খেলাপির হার ৬০ দশমিক ৬৩ শতাংশ, ইসলামী ব্যাংকের ৫৮ দশমিক ২৪ শতাংশ ও এক্সিম ব্যাংকের ৫৬ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
ব্যাংকের এই চরম দুরবস্থা কাটাতে হলে বাংকের ঋণ প্রাপ্তির বিষয়টি রাজনৈতিক চাপমুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি ব্যাংককর্মীর আচরণটাও ভালো করার প্রয়োজন। ক্ষুদ্রঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে গ্রাহক ভোগান্তি দূর করা দরকার। সরকারসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এই বিষয়গুলো নিরীক্ষণ করে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া উচিত।

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন

লেখক: প্রাবন্ধিক কলামিস্ট