
অষ্টাদশ শতাব্দীর সমাজব্যবস্থা, কুসংস্কার আর এক ১৬ বছর বয়সী কিশোরী বধূর করুণ আত্মত্যাগের নীরব সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে ঝালকাঠির ঐতিহ্যবাহী কীর্তিপাশা জমিদার বাড়ি। তবে সতীদাহ প্রথার বেদনাবিধুর স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহাসিক এ স্থাপনাটি দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এখন ধ্বংসের শেষ প্রান্তে পৌঁছেছে।
ইতিহাস সূত্রে জানা যায়, ১৮২৮ সালে জমিদারি বিরোধের জেরে মাত্র ২২ বছর বয়সে রহস্যজনকভাবে মারা যান জমিদার কালী প্রসন্ন কুমার সেনগুপ্ত। তাঁর মৃত্যুর পর পরিবারের সদস্যরা ১৬ বছরের কিশোরী স্ত্রী হরসুন্দরী দেবীর বিরুদ্ধে বিষপ্রয়োগের অপবাদ তোলেন। নির্দোষ হরসুন্দরী এই অপবাদ ও অবিশ্বাসের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে স্বামীর জ্বলন্ত চিতায় ঝাঁপ দিয়ে আত্মাহুতি দেন। এই ঘটনার পরপরই ১৮২৯ সালে ব্রিটিশ সরকার আইন করে সতীদাহ প্রথা আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করে। এ অঞ্চলে হরসুন্দরীর পর আর কোনো সহমরণের ঘটনা ঘটেনি।
কালের বিবর্তনে জমিদার বাড়ির ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলো প্রায় বিলীন হতে চলেছে। বর্তমানে বড় হিস্যার নাটমন্দির, হলঘর ও ছোট একটি মন্দির জরাজীর্ণ অবস্থায় টিকে আছে। চত্বরটিতে বর্তমানে প্রসন্ন কুমার মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং কমলিকন্দ নবীন চন্দ্র বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সরেজমিনে দেখা যায়, মূল ভবনটি লতাপাতা ও ঝোপঝাড়ে ঢেকে গেছে। দেয়ালের ইট-প্লাস্টার খসে পড়ছে এবং ভাঙা দরজাজানালার মধ্যে এটি পরিত্যক্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। এমনকি এটি যে একটি ঐতিহাসিক স্থান, সে সংক্রান্ত কোনো তথ্যমূলক সাইনবোর্ডও নেই।
স্থানীয় অধিবাসী বিমল চন্দ্র দে ও বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ ঝালকাঠি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অলোক সাহা গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, প্রতিনয়ত দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ হরসুন্দরীর স্মৃতি বিজড়িত স্থানটি দেখতে এসে হতাশ হন। এই ঐতিহাসিক ঐতিহ্যকে দ্রুত প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করে সরকারিভাবে সংরক্ষণের জোর দাবি জানান তাঁরা।
এ বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (সাবেক বরিশাল ও খুলনা অঞ্চল) মো. মহিদুল ইসলাম জানান, ঝালকাঠি জেলায় পূর্ণাঙ্গ প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ এখনো পরিচালিত হয়নি। তবে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ জরিপ সম্পন্ন হলে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ ও সংস্কারের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আপনার মতামত লিখুন :