
সম্পর্কের টানাপোড়েন আর ঠুনকো কারণে যখন প্রতিনিয়ত সংসার ভাঙছে, ঠিক তখনই নওগাঁয় দেখা মিলল ভালোবাসার এক অনন্য ও রূপকথার মতো দৃষ্টান্ত। স্বামীর পঙ্গুত্ব কিংবা পায়ের ৪ কেজি ওজনের টিউমার—কোনো কিছুই দমাতে পারেনি দীপা নামে এক নারীর ভালোবাসা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে। সমস্ত সামাজিক ও পারিবারিক বাধা উপেক্ষা করে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে অসুস্থ স্বামীর হাত ধরে সংসারের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন এই নারী। তবে বর্তমানে চরম অর্থের অভাবে থমকে গেছে এই দম্পতির জীবন।
ঘটনার সূত্রপাত ২০১১ সালে। এইচএসসি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী দীপা যখন ভালোবেসে সজিবকে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন, তখন সজিবের পায়ে বাসা বেঁধেছে ৪ কেজি ওজনের এক বিশাল টিউমার। এর আগে ২০০৫ সালে স্কুল ক্রিকেট খেলতে গিয়ে সজিবের হিপ জয়েন্ট ভেঙে যায় এবং পরবর্তীতে ২০০৮ সালে তার শরীরে এই মরণব্যাধি ধরা পড়ে। বিয়ের সিদ্ধান্তে দীপার পরিবারের তীব্র বিরোধিতা, থানা-পুলিশ কিংবা সমাজের সালিশ-বৈঠক—কোনো কিছুই সজিবের পাশ থেকে সরাতে পারেনি দীপাকে। সব বাধা উপেক্ষা করে পঙ্গু সজিবের হাতটি শক্ত করে আঁকড়ে ধরেন তিনি।
নওগাঁ সদর উপজেলার বোয়ালিয়া উত্তরপাড়া এলাকার এই দম্পতির ঘরে বর্তমানে দুটি ছেলে সন্তান রয়েছে। ২০১৮ সালে ভারত থেকে অপারেশন করিয়ে ফিরে আসার পর অটোরিকশা চালিয়ে সংসারের হাল ধরেন সজিব। অন্যদিকে, দীপা উচ্চমাধ্যমিক পাসের পর একটি এনজিওর স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। কিন্তু তাদের এই সুখের দিন বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ২০২৩ সালে আবারও সজিবের পায়ে টিউমার ধরা পড়লে চিকিৎসার খরচের জন্য শেষ সম্বল অটোরিকশাটি বিক্রি করে দিতে হয়। একই সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায় দীপার স্কুলের চাকরিও।
অশ্রুসিক্ত চোখে দীপা বলেন, “আমি যখন সজিবকে বিয়ে করি, তখনই ওর পায়ে টিউমার ছিল। অনেক কষ্ট করতে হয়েছে আমাদের। তারপরও আমি ওকে ছেড়ে যাইনি, আর কোনোদিন যাবও না। এখন আবার ওর টিউমারটা ধরা পড়ায় আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে। বর্তমানে চিকিৎসা করানোর মতো কোনো টাকা আমাদের কাছে নেই।” চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, সজিবের উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন প্রায় ১৪ থেকে ১৫ লাখ টাকা। যা এই মুহূর্তে নিঃস্ব পরিবারের পক্ষে জোগাড় করা একেবারেই অসম্ভব।
অসুস্থ সজিব বলেন, “পঙ্গু হাসপাতালে অপারেশনের পর যখন টিউমার ধরা পড়ে, তখনও দীপা আমার হাত ছাড়েনি। ভারতে গিয়ে চিকিৎসা করানো ও অপারেশনে পা কেটে ফেলার পর সবকিছু ও একহাতে সামলেছে। আমি ওকে অনেকবার বলেছি আমার মতো পঙ্গুর সাথে সংসার না করে অন্য কোথাও চলে যেতে, কিন্তু ও রাজি হয়নি।”
এ বিষয়ে নওগাঁ জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “তিনি যদি উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে চিকিৎসার সহায়তার জন্য সরকারের কাছে লিখিত দরখাস্ত করেন, তবে আমাদের পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগিতা করা হবে। পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে এলে পরিবারটি রক্ষা পাবে।”
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, প্রেমের এমন আত্মত্যাগ ও সততা বর্তমান যুগে সত্যিই বিরল। অর্থের অভাবে যেন সজিব-দীপার এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার গল্পটি অকালে ঝরে না যায়, সেজন্য সমাজের মানবিক ও বিত্তবান মানুষদের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আকুতি জানিয়েছেন তারা।
আপনার মতামত লিখুন :