
প্রতিবছরের মতো এবারো পবিত্র মাহে রমজানে অসহায়, দুস্থ ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য মানবিক কার্যক্রমে নেমেছেন ক্রিকেটার আরিফা জাহান বিথী। এবার পুরো রমজান মাসে নয় হাজার রোজাদার ব্যক্তিকে ইফতার করানোর উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। তার এ উদ্যোগে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন অনেকেই।
বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রংপুর নগরীর ঘনবসতিপূর্ণ স্টেশন পাটবাড়ি, মণ্ডলপাড়া ও খেড়বাড়ি এলাকার অসহায় দুস্থ, এতিম ও বৃদ্ধ মা-বাবাসহ কর্মহীন দুই শতাধিকের বেশি রোজাদার ব্যক্তিকে নিয়ে ইফতারের আয়োজন করে আরিফা জাহান বিথীর প্রতিষ্ঠিত উইমেন্স ড্রিমার ক্রিকেট একাডেমি অ্যান্ড হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশন।
শুক্রবারও একই স্থানে রোজাদার ব্যক্তিদের নিয়ে ইফতারের এই আয়োজন রয়েছে। গতবছর রমজান মাসে ছয় হাজার রোজাদার ব্যক্তি বিথীর এই মানবিক কার্যক্রমে ইফতার করেছেন।
উদ্যোক্তা আরিফা জাহান বিথী জানান, নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি ও রমজানে হু হু করে ইফতারসামগ্রীর দাম বাড়ায় অসহায়, দুস্থ, কর্মহীন, শ্রমিক ও দিনমজুরসহ মধ্যবিত্ত মানুষেরা নানামুখী সমস্যায় পড়েন। বিশেষ করে যাদের এক দিন কাজ না করলে চুলায় হাড়ি ওঠে না, তারা পড়েন সবচেয়ে বিপাকে। এসব মানুষের পাশে দাঁড়াতেই বিগত সময়ের মতো এ বছরও এই মানবিক কার্যক্রমে শুরু করেছেন তিনি।
এবার পুরো রমজান মাসে নয় হাজার রোজাদার ব্যক্তিকে ইফতার করানোর উদ্যোগ নিয়েছেন বিথী। এই উদ্যোগের কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তিনি তুলে ধরেছেন। যা দেখে, সহযোগিতার হাত বাড়াতে অনেকেই এগিয়ে এসেছেন।
আরিফা জাহান বিথী বলেন, সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই এতিম, দুস্থ, অসহায় মানুষদের পাশে থাকার চেষ্টা করছি। সেই লক্ষ্য নিয়েই মাহে রমজানে রোজাদারদের ইফতার করানোসহ ইফতারসামগ্রী বিতরণের কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে ২০০ রোজাদারকে ইফতার প্যাকেট বিতরণ করা হবে। এভাবে পুরো রমজানে নয় হাজার রোজাদারকে ইফতার দেওয়া হবে।
সাবেক এই ক্রিকেটার বলেন, ইফতারের একেকটা প্যাকেটের খরচ পড়েছে ১০০ টাকা। পোলাও, মুরগি, জিলাপি, বুট ভুনা, খেজুর, শসা, গাজর, তরমুজ ইত্যাদিসহ একেক দিন একেকটি আইটেম থাকবে প্যাকেটে। প্রতিদিন ২০০ জন রোজাদারের জন্য খরচ পড়বে ২০ হাজার টাকা। পুরো একমাসে অর্থাৎ রমজানের ৩০ দিনে সর্বমোট খরচ পরবে ৬ লাখ টাকা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে মহতী এ উদ্যোগের কথা জানিয়ে একটি পোস্ট করেছেন বিথী। সেখানে তিনি বলেছেন, এই কার্যক্রমে সামর্থ্য অনুযায়ী যে কেউ সহযোগিতা করতে পারবেন। একটি প্যাকেটের জন্য ১০০ টাকা করে।
কেউ চাইলে সামর্থ্য অনুযায়ী ২ জন, ৩ জন বা তার বেশি মানুষের ইফতারের দায়িত্ব নিতে পারেন। অথবা ৩ হাজার টাকায় একজন রোজাদারের পুরো মাসের দায়িত্ব নিতে যে কেউ এগিয়ে আসতে পারবেন। এই উদ্যোগে কেউ সহযোগিতা করতে চাইলে বিকাশ ও নগদ করতে পারেন +৮৮০১৮৬৭৫৭৮২৩০ নম্বরে। এ ছাড়া রকেট নম্বরেও +৮৮০১৮৬৭৫৭৮২৩০৬ সহযোগিতা পাঠাতে পারেন।
এদিকে, ইফতার করানোর পাশাপাশি অস্বচ্ছল, বিধবা ও কর্মহীন বয়স্ক পরিবারের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছেন বিথী। তালিকা করা ২৮০টি পরিবারের প্রত্যেককে ১৫০০ টাকা প্যাকেটে রমজানের বাজার বা ইফতার সামগ্রী হিসেবে চাল, ছোলা, ডিম, ডাল, মুড়ি, আলু, তেল ও লবণ পৌঁছে দিচ্ছেন তিনি। গতকাল রংপুরের আউলিয়াগঞ্জ এলাকায় বেশিকিছু পরিবারের মাঝে এসব খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হয়।
করোনা মহামারিতে এই কার্যক্রম শুরু করেছিলেন বিথী। এখন সেই ধারাবাহিকতা ধরে রেখে সমাজের অসহায়-দুস্থ মানুষের জন্য কাজ করছে তার প্রতিষ্ঠিত উইমেন্স ড্রিমার ক্রিকেট একাডেমি অ্যান্ড হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশন।
সেবামূলক কাজের জন্য বিভিন্ন সংগঠন, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান থেকে অনুপ্রেরণা পাওয়া আরিফা জাহান বিথী বলেন, সবকিছুর মালিক আল্লাহ, আমরা সবাই মাধ্যম মাত্র। যারা পাশে থেকে দায়িত্ব নিয়েছেন তাদের প্রতি অনেক কৃতজ্ঞতা আমার। সবার সহযোগিতা পেলে রমজানজুড়ে অসহায়-দুস্থ মানুষদের ইফতার করানো অব্যাহত রাখা হবে।
প্রসঙ্গত, আরিফা জাহান বীথি ২০১০ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ প্রথম বিভাগ ক্রিকেটে খেলেছেন। ঢাকার ওরিয়েন্ট স্পোর্টিং ক্লাব, কলাবাগান, রায়েরবাজার ক্রিকেট দলে ওপেনিং ব্যাট করতে নামতেন। ২০১৭ সালে অসুস্থতার কারণে চিকিৎসকের পরামর্শে ক্রিকেট ক্যারিয়ার বিসর্জন দিতে হয়েছে তাকে।
ঢাকা থেকে রংপুরে ফিরে ২০১৯ সালের ২৬ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে রংপুর জেলা স্টেডিয়ামে নারীদের জন্য উইমেন্স ড্রিমার ক্রিকেট একাডেমি নামে প্রশিক্ষণ একাডেমি গড়েন বিথী। সেখানে কয়েকশ নারীকে বিনামূল্যে ক্রিকেট প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন তিনি।
করোনা মহামারির শুরুর দিকে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের সেবার জন্য ফেসবুকে সবার কাছ থেকে সহায়তা চেয়েছিলেন আরিফা জাহান বিথী। তার আহ্বানে দেশসেরা ক্রিকেটারদের অনেকেই সাড়া দিয়ে পাশে দাঁড়ান। এসময়ে নিজের জমানো টাকা আর অন্যের আর্থিক সহযোগিতার সমন্বয়ে কয়েক হাজার মানুষের দুয়ারে চাল, ডাল, তেল, লবণ, ফল, দুধ, ডিম ও হরলিকসসহ প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার পৌঁছে দিয়েছেন।
তখন থেকে অসহায়, দুস্থ, কর্মহীন মানুষের পাশাপাশি সন্তানসম্ভবা নারীদের সেবামূলক সহায়তা দিয়ে আসছেন তিনি। এরপর থেকে সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন এই ক্রিকেটার।
ইতোমধ্যে তার সহযোগিতায় কয়েক’শো নারীকে স্বাবলম্বী হয়েছেন। গৃহহীন বৃদ্ধা মা-বাবা পেয়েছেন নতুন ঘর। সহায়-সম্বলহীন শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে ভর্তির জন্য আর্থিক সহযোগিতা দিয়েছেন বিথী। বিভিন্ন সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগে সহায়তার হাত বাড়িয়েছেন। শুধু তাই নয়, রংপুর বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় মসজিদ, মাদ্রাসা নির্মাণ করে দেওয়ার পাশাপাশি পবিত্র কুরআন শরীফও বিতরণ করে আসছেন বিথী। এছাড়াও প্রতিবছর শীতের মৌসুমে স্বাবলম্বী পিঠা মেলা আয়োজনের মাধ্যমে নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কাজ করছেন তিনি।
আপনার মতামত লিখুন :